Wednesday, May 25, 2016

ফেড কাপ জিতে বীরের সংবর্ধনা পেল মোহন বাগান | বর্তমান

সোমনাথ বসু : সকাল দশটা থেকেই ভিড় জমছিল দমদম বিমানবন্দরে। বাইক, ম্যাটাডোর, মিনিডোরে করে সমর্থকরা দলে দলে হাজির হচ্ছিলেন। ‘আমাদের সূর্য মেরুন, নাড়ির যোগ সবুজ ঘাসে’র আবহে মোহন বাগান অনুরাগীদের আবেগ যেন চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছিল। হাতে পতাকা, মাথায় ফেট্টি, পরণে প্রিয় দলের জার্সি। সঞ্জয় সেন, দেবজিৎ মজুমদারের নামে জয়ধ্বনিতে কান পাতা দায়। বিমানবন্দরের বাতাসের রং তখন সবুজ-মেরুন। মাঝেমধ্যেউ অতি উৎসাহীরা শূন্যে ছড়িয়ে দিলেন আবির। সবমিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ। 

গুয়াহাটি থেকে আগত ইন্ডিগো বিমান কলকাতার মাটি স্পর্শ করল বুধবার দুপুর দুটোয়। সেই খবর দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে অপেক্ষমান সমর্থকদের মধ্যে। মধ্যাহ্নের আকাশ তখন কালো মেঘে আচ্ছন্ন। সঙ্গে প্রবল ঝড়। বাগবাজারের তরুণ বা উল্টোডাঙ্গার বাবুয়াদের হাতে থাকা সবুজ-মেরুন পতাকা সেই ঝোড়ো হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে। স্লোগানের গতি ক্রমবর্ধমান। প্রায় ৪৫ মিনিট পর অর্থাৎ পৌনে তিনটে নাগাদ বিমানবন্দরের বাইরে বেরলেন ফেডারেশন কাপ জয়ী মোহন বাগান ফুটবলাররা। অর্থ-সচিবের পরিকল্পনামতো বাসে উঠলেন কিংশুক-ধনচন্দ্ররা। এই পর্বে সবচেয়ে আবেগপ্রবণ ছিলেন গার্সিয়া। জানালার পাশে বসে একনাগাড়ে সবুজ-মেরুন পতাকা নাড়ছিলেন তিনি। বাসের সামনে, পাশে এবং পিছনে ছিল মোহন বাগান সমর্থকদের বিশাল বাইকবাহিনী। ম্যাটাডোরে রাখা বক্সে তখনও বেজে চলেছে ‘সবুজ-মেরুন’ গান। বিমানবন্দর থেকে কিছুটা এগতেই শোভাযাত্রায় বিঘ্ন ঘটায় বৃষ্টি। কিন্তু আবেগের বাঁধ রোখে কার সাধ্য। মোবাইল ফোনগুলি প্ল্যাস্টিকের মধ্যে কোনওরকমে পুরে ভিজতে ভিজতেই সমর্থকরা এগিয়ে চলেন ক্লাবের উদ্দেশ্যে। বাগুইআটি, উল্টোডাঙ্গা, কাঁকুড়গাছি, গিরিশ পার্ক, সেন্ট্রাল এভিনিউ, ধর্মতলা ধরে শোভাযাত্রা শেষ হয় মোহন বাগান ক্লাবে। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বাগুইআটি-গিরিশ পার্ক অঞ্চলে পথের দু’ধারে ফেড কাপ জয়ীদের দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলেন প্রচুর সবুজ-মেরুন সমর্থক। বৃষ্টিভেজা রাস্তায় চাকা স্কিড করে চারটি ছোট দুর্ঘটনাও ঘটে। 
মোহন বাগান তাঁবুও সেজেছিল সকাল থেকে। ফুল দিয়ে সাজানো প্রধান ফটকের সামনে ‘আমরাই ভারতসেরা’ ব্যানার। তাঁবুতে ঢোকার সময় সমর্থকদের মুখে গর্বিত বিজয়ীর হাসি। দেখা গেল, সেলফি বা গ্রুপফি তোলার হুড়োহুড়িও। ঐতিহাসিক লনে বাঁধা ছিল মঞ্চ। সেখানে রাখা ব্যানারের সামনেও উপচে পড়েছে ভিড়। ক্লাবতাঁবুতে জড় হয়েছিলেন প্রায় হাজার দুয়েক সমর্থক। লনে রাখা বক্সে বেজেই চলেছে, ‘চিরকাল রেলায় আছে, থাকবে মোহন বাগান’। বৃষ্টি শুরু হতেই সবাই খুঁজে নিলেন শেড। কিন্তু উদ্যমে ভাঁটা পড়ল না। আমরা কারা/মোহন বাগান, ভারতসেরা/মোহন বাগান ধ্বনি তখন পৌঁছে যাচ্ছে পাশের ক্লাবেও। বৌবাজারের ৮২ বছরের শান্তি পাল হাতে পতাকা ধরে বেঞ্চে বসে পাশে দাঁড়ানো এক যুবককে জিগ্যেস করলেন, ‘বাবা, আর কতক্ষণে ওরা এসে পড়বে?’ একটু দূরে সবুজ-মেরুন সালওয়ারে ছোট্ট ঝিলমিলের (সমর্থকরা এই নামেই ডাকছিলেন) চোখেও অপেক্ষা। 
প্রফুল্ল প্যাটেল, কুশল দাসরা কি এই ছবি দেখতে পাবেন? কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ খরচ করে ইন্ডিয়ান সুপার লিগে এই আবেগ কোথায়? প্রথম বছর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আতলেতিকো ডি কলকাতা দলকে যখন মধ্য কলকাতার একটি শপিং মলে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল তখন কত সমর্থক ছিল? মেরেকেটে দু’শো। মিস্টার প্যাটেল, ভারতীয় ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মোহন বাগান-ইস্ট বেঙ্গলের মতো জনভিত্তিসম্পন্ন ক্লাবকে বাদ দেওয়া যায় না। দিলে সর্বনাশ অবধারিত। সনি নেই, জেজেরা জাতীয় ক্যাম্পে, ফেড কাপ জয়ের চারদিন পরে ট্রফি নিয়ে শহরে ফেরা-- তা সত্ত্বেও মোহন বাগানীদের এই আবেগ চোখে পড়ার মতো। 
দুপুর তিনটে নাগাদ বৃষ্টি মাথায় নিয়েই ক্লাবতাঁবুতে পা রাখলেন কাটসুমি। তাঁকে দেখেই ইউসা, ইউসা চিৎকার সমর্থকদের। সচিবের ঘরে তখন বসে আছেন কম্পটন দত্ত, সত্যজিৎ চ্যাটার্জি, বাবু মানি, বিদেশ বসুরা। ক্লাব জুড়ে উৎসবের পরিবেশ। প্রবল বৃষ্টি দেখে সহ-সচিব চিন্তিত, কোথায় সংবর্ধনা দেওয়া হবে? শেষ পর্যন্ত বাস ক্লাবতাঁবুতে আসার আগেই থেমে গেল বারিধারা। আকাশবাণীর সামনে বাস দেখেই ভিতর থেকে সমর্থকরা বেরিয়ে এলেন তাঁবুর সামনে। উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা মিলেমিশে একাকার। বাসের মাথাতেও জনা দশেক কিশোর অনুরাগী হাওয়ায় আবির ভাসিয়ে গোষ্ঠ পাল সরণিকে রঙিন করে তুলল। উল্লেখ্য, তাঁবুতে হাজির ছিলেন প্রায় হাজার দুয়েক সমর্থক। 
বাস থেকে নেমে একে একে মঞ্চের দিকে হেঁটে গেলেন ফেড কাপ জয়ী ফুটবলাররা। গেটের দু’ধারে খুদে মোহন বাগান ফুটবলাররা সারিবদ্ধ হয়ে অভিনন্দন জানাল সিনিয়রদের। কর্দমাক্ত লনে তখন পা রাখার জায়গা নেই। কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে ফেন্সিংয়ের উপর উঠে পড়েছেন। মঞ্চের উপর বিশেষ একটি জায়গায় রাখা হয় ফেডারেশন কাপটিকে। প্রদীপ চৌধুরি মালা পরিয়ে দেন কোচ সঞ্জয় সেনকে। ফেডারেশন কাপ জয়ী অধিনায়করা একে একে সংবর্ধিত করেন ধনচন্দ্র, কাটসুমি, কিংশুকেদর। প্রাক্তন অধিনায়কদের মধ্যে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন প্রদীপ চৌধুরি, কৃষ্ণেন্দু রায়, কম্পটন দত্ত, বাবু মানি, অমিত ভদ্র, বিশ্বনাথ মণ্ডল প্রমুখ। এছাড়া অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন সংসদ সদস্য প্রসূন ব্যানার্জি, মানস ভট্টাচার্য, বিদেশ বসু, উলগানাথন। তবে আমন্ত্রণ না পাওয়ায় এই অনুষ্ঠানে আসেননি কোচ ও ফুটবলাররূপে মোহন বাগানকে সবচেয়ে বেশি ট্রফি দেওয়া সুব্রত ভট্টাচার্য। 
কোচ সঞ্জয় সেন আবেগতাড়িত হয়ে বলেন, ‘যদি আগামী মরশুমে কোচ থাকি তাহলে আই লিগ ও ফেডারেশন কাপ, দুটোই জেতার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করব। সমর্থকদের প্রেরণা না থাকলে আজ এই জায়গায় পৌঁছাতে পারতাম না। ফেডারেশন কাপ জয়ের পুরো কৃতিত্বটাই ফুটবলারদের। ওরাই মোহন বাগানের হয়ে মাঠে ঘামরক্ত ঝরিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।’ কোচের বক্তব্য শুনে হাততালিতে ফেটে পড়ে মোহন বাগান তাঁবু। তবে মাইক্রোফোনে একাধিকবার সমস্যা হওয়ায় কোচ-উবাচ শোনা থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়েছে অনেককেই। তবে এই সুখের দিনে মাইক-সমস্যাকে আমল দিতে নারাজ উৎসাহী অনুরাগীরা। অনুষ্ঠানের শেষে কাটসুমি ক্লাব পতাকা উত্তোলন করেন। মরশুমের অধিনায়ক শিলটন পাল তখন বহরমপুরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে। লুসিয়ানো এদিন সকালের ফ্লাইটে কলকাতায় এসে গোছগাছে ব্যস্ত। বৃহস্পতিবারই তিনি ফিরে যাবেন ব্রাজিলে। তাই এই অনুষ্ঠানে আসেননি সবুজ-মেরুন ডিফেন্ডারটি। 
বিকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা হওয়ার মুখেও মোহন বাগান তাঁবু ছিল সমর্থকদের দখলে। ক্যান্টিনের সামনে দাঁড়িয়ে চায়ের পেয়ালায় তুফান তুলে বা গেটের বাইরে রাখা কাঠের বেঞ্চে বসে সমর্থকরা তখনও বলে চলেছেন, ‘এই সাফল্য আগামী মরশুমেও ধরে রাখতে হবে।’
২০১৪-১৫’য় আই লিগ আর ২০১৫-১৬’য় ফেডারেশন কাপ। ভারতসেরা হওয়ার গর্বে আমোদিত শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব। যা ভুলিয়ে দিয়েছে এএফসি কাপ থেকে বিদায়ের ঘটনাকে।

No comments:

Post a Comment